শাবাব-মাহি হত্যা কান্ড : দুই বছরেও শেষ হয়নি তদন্ত

.ইমাদ উদ দীনঃমৌলভীবাজারের চাঞ্চল্যকর জোড়া খুনের ২ বছর হলেও মামলার নেই কার্যক্রর অগ্রগতি।

এনিয়ে স্থানীয় বাসিন্দা,শিক্ষার্থী, সহপাঠী,অভিভাভাবক ও তাদের পরিবারের সদস্যদের মধ্যে চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে। শনিবার ৭ ডিসেম্বর সাথে আলাপে এমনটিই জানান সংশ্লিষ্টরা। দলীয় অভ্যন্তরীণ দ্বন্ধে নিজ দলের নেতাকর্মীদের হাতে খুন হওয়া ছাত্রলীগ নেতা মোহাম্মদ আলী শাবাব ও কর্মী নাহিদ আহমদ মাহি হত্যা মামলার বিচার দুই বছর পেরিয়ে গেলেও এখন শেষ হয়নি তদন্ত কাজ। বর্তমানে মামলাটির তদন্ত করছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) মৌলভীবাজার ব্রাঞ্চ।গেল একবছর থেকেই এই মামলার তদন্ত কাজ করছে পিবিআই।

২০১৭ সালের ৭ ডিসেম্বর গ্র”পিং দ্বন্ধে মৌলভীবাজার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠের একই স্থানে ঘর থেকে মুঠোফোনে ডেকে নিয়ে হত্যা করা হয় ছাত্রলীগ নেতা ও মৌলভীবাজার সরকারী কলেজের সম্মান ৩য় বর্ষের শিক্ষার্থী মোহাম্মদ আলী শাবাব। ও কোচিং থেকে বাড়ি ফেরার পথে ছাত্রলীগ কর্মী মৌলভীবার সরকারী উচ্চ বিদ্যালয়ের ৯ম শ্রেণীর শিক্ষার্থী নাহিদ আহমদ মাহিকে। এঘটনায় নিহত শাবাবের মা সেলিনা রহমান চৌধুরী বাদী হয়ে মৌলভীবাজার মডেল থানায় ১২ জনকে আসামী করে হত্যা মামলা দায়ের করেন। কিন্তু মামলা দায়ের দুই বছর পেরিয়ে গেলেও এখনও এই হত্যা মামলার কার্যক্রর কোনো অগ্রগতি হয়নি। ক্ষোভের সাথে এমনটিই জানাচ্ছেন ওদের পরিবারের সদস্যরা।

জানা যায় বাদীর নারাজির প্রেক্ষিতে মামলাটির তদন্ত ভার ন্যাস্ত হয় পিবিআই এর উপর। দ্বায়িত্ব পাওয়ার পর গেল এক বছর থেকে এখনো তারা মামলাটি তদন্ত করছেন। আলোচিত এ জোড়া খুনের ঘটনায় শাবাবের পরিবার থেকে তার মা সেলিনা রহমান চৌধুরী বাদী হয়ে মামলা করলেও ওই খুনের ঘটনায় মামলাটির এরকম পরিণতি হবে জেনে মাহির পরিবারের পক্ষ থেকে কেউ মামলা দায়ের করেননি।

নিহত শাবাবের মা সেলিনা রহমানের অভিযোগ আসামীরা প্রকাশ্যে ঘুরা-ফেরা করে তাদের ভয়-ভীতি দেখাচ্ছে। নানা ভাবে হত্যার হুমকি ধমকিও অব্যাহত রেখেছে। এজন্য নিজের নিরাপত্তা চেয়ে মৌলভীবাজার মডেল থানায় তিনি জিডি করেছেন। জিডিতে তিনি প্রতিপক্ষ আনিসুল ইসলাম তোষারসহ ৭ জনের নাম উল্ল্যেখ করে বলেন,শাবাব হত্যা মামলার এ আসামীরা হাজতে থেকে পরবর্তীতে জামিনে মুক্তি পায়। এর পর থেকেই তারা মোটরসাইকেল যোগে আমাকে প্রকাশ্যে হুমকি দেয়। তিনি তার ও তার পরিবারের সদস্যদের নিরাপত্তা চেয়ে চলতি বছরের ১২ ফেব্র”য়ারী থানায় (জিডি নং-৭১৬) জিডি করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে নিরাপত্তার দাবি জানান। কান্নাজড়িত কন্ঠে তিনি বলেন তার পুত্র হত্যার পরিবেশ সৃষ্টিকারী হোতা ফাহিম মোনতাছিরকে আইনের আওতায় না এনে চার্জশীট দেয় পুলিশ। সমস্ত চার্জশীট এলোমেলো ভাবে দেয়ার কারণে মামলার তদন্তভার আদালত পিবিআইতে পাঠায়। মামলা তদন্তাধীন থাকা সত্ত্বেও আসামীরা আমাদের হুমকি দিচ্ছে। তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন তারা কার আশ্রয়-পশ্রয়ে এতো বেপরোয়া হয়ে গেল? তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে পুত্র হত্যার বিচার দাবি জানান।

শাবাবের বাবা আবুবক্কর সিদ্দিক বলেন পুত্র হত্যা মামলার এখনো কোনো উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখছিনা। রাজনৈতিক প্রশ্রয়ে আসামী পক্ষের লোকজন প্রকাশ্যে চলাফেরা করছে। এক আসামী ইতিমধ্যে পালিয়ে বিদেশে চলে গেছে। তিনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে বিদেশ পালিয়ে যাওয়া আসামীকে দেশে আনা, যারা জামিনে আছে ও চার্জশীট থেকে বাদ পড়েছে সকলকেই সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে সর্বোচ্চ বিচারের আওতায় আনার জোর দাবি জানান। তিনি বলেন ওই দিন কে বা কারা ফোন করে শাবাবকে নিয়ে গেছে এই ঘটনা এখনও উদঘাটন হয়নি। পুলিশের তদন্তেও তা তুলে ধরা হয়নি। এই বিষয়টি সঠিকভাবে তদন্ত করা হলে ঘটনার মূল রহস্য উদঘাটন হত। শাবাব তার ফোনে কল পাওয়ার আধা ঘন্টা পরেই তাকে হত্যা করা হয়। কিন্তু পিবিআই আজ এতদির ধরে তদন্ত করছে কিন্তু ঘটনার কোন রহস্য এখনও উদঘাটন করতে পারে নি। নিহত নাহিদ আহমদ মাহির মামা এমজি ইমরান আলী বলেন,আমরা ন্যায় বিচার পাব না বলে মামলা দায়ের করিনি। শাবাবের পরিবারের পক্ষ থেকে দায়ের করা মামলাটি এখনও পিবিআইতে আছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত তো কোন রহস্য উদঘাটন করতে পারে নি।

মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায় নিহত ছাত্রলীগ নেতা শাহবাবের সাথে ছাত্রলীগ নেতা তুষার গ্র”পের বিরোধের কারণেই তুষার শাবাবকে হত্যার চেষ্টা চালায়। শাবাব খুন হওয়ার ১০/১২ দিন পূর্বে নিহত মাহির সাথে তুষার গ্র”পের ফাহিমের ঝগড়া হয়। এই বিষয়টি মিমাংসা করার জন্যই ঘটনার দিন ৭ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় শাবাব ও মাহিকে সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় ছাত্রাবাস এলাকায় ডাকা হয়। সেখানে তুষার গ্র”পের নেতাকর্মীরা শাবাব ও মাহিকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করে। এসময় ঘটনাস্থলে থাকা শাবাব ও মাহির বন্ধুরা ও পথচারিরা গুর”ত্বর আহত শাবাব ও মাহিকে মৌলভীবাজার সদর হাসপাতালে নিয়ে যায়। হাসপাতালে পৌঁছালে কর্তব্যরত ডাক্তার অতিরিক্ত রক্ত করনে তাদের মৃত্যু হয়েছে বলে নিশ্চিত করেন। লোমহর্ষক এ হত্যাকান্ডের দীর্ঘ প্রায় ১ বছর পর আদালতে চার্জশীট দায়ের করেন মৌলভীবাজার মডেল থানার তৎক্ষালীন ওসি সোহেল আহাম্মদ। তিনি তুষারসহ ১০আসামীকে অভিযুক্ত করে চার্জশীট দেন। কিন্তু বাকী দুই আসামীকে চার্জশীটের অন্তভূক্ত না করায় বাদীর নারাজির প্রেক্ষিতে মামলাটি পিবিআইতে প্রেরণ করেন আদালত। নিহত শাবাব মৌলভীবাজার শহরের পূরাতন হাসপাতাল সড়ক এলাকার আবুবক্কর সিদ্দিক ও সেলিনা রহমানর কনিষ্ঠ পুত্র।

মাহি সদর উপজেলার কনকপুর ইউনিয়নের দুর্লভপুর গ্রামের বিল্লাল মিয়া ও জুলেখা বেগম এর পুত্র। এবিষয়ে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা পুলিশ পরিদর্শক (পিবিআই) মো: নজর”ল ইসলাম ও পিবিআই মৌলভীবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার নজর”ল ইসলাম মুঠোফোনে জানান মডেল থানার তদন্তে ১২ আসামীকে চার্জশীট ভুক্ত করা হয়েছিলো। ওই চার্জশীট থেকে দুই আসামী বাদ পড়ায় বাদীর নারাজির প্রেক্ষিতে আমরা ওই দুই আসামী জড়িত আছে কি না সেই বিষয়টি তদন্ত করছি। এছাড়াও অজ্ঞাত সন্দেহভাজন আরো ৬/৭ জন আসামী ওই ঘটনার সাথে সম্পৃক্ত ছিলো কিনা তাও খতিয়ে দেখছি। তবে চার্জশীটের ওই ১০ আসামী ঘটনার সাথে সম্পৃক্ত রয়েছে বলে জানান তারা। নিবিড় ও নিখোঁত ভাবে তদন্ত করতে তদন্ত কাজে একটু বিলম্ব হচ্ছে জানিয়ে তারা বলেন খুব শিগগিরই তদন্ত রিপোর্ট আদালতে পেশ করা হবে।