মৌলবভীবাজার জেলার মনু নদীর বিদ্যমান সমস্যা সমাধানে “পানি উন্নয়ন বোর্ড” কর্তৃক গৃহিত পদক্ষেপ:

মাহমুদঃ স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ট বাঙ্গালী জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বাধীনতা উত্তর যুদ্ধ বিদ্ধস্থ বাংলাদেশ বিনির্মাণে প্রথম লক্ষ্যই ছিল খাদ্যে স্বয়ং সম্পূর্ণতা অর্জন। আধুনিক প্রযুক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে উর্বর জমি সমৃদ্ধ এই দেশের কৃষি খাতকে উৎপাদনশীলতার শীর্ষে নেয়ার প্রচেষ্টাই সরকারের মূখ্য উদ্দেশ্য। পানি সম্পদ মন্ত্রনালয়ের অধীনে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের রুলস অব বিজনেস এর এলোকেশন অব বিজনেস অনুযায়ী কর্ম-পরিধি ও বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড আইন ২০০০ অনুসারে নদী ও অববাহিকা নিয়ন্ত্রণ ও উন্নয়ন এবং বন্যা নিয়ন্ত্রণ,

পানি নিষ্কাশন, সেচ ও খরা প্রতিরোধের লক্ষ্যে নদী শাসন, জলাধার, ব্যারেজ, বাঁধ, রেগুলেটর বা অন্য যে কোন অবকাঠামো নির্মাণের জন্য প্রকল্প প্রনয়ণ ও বাস্তবায়নের জন্য মূল প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড। বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের চা-বাগান ও ছোট ছোট টিলা বেষ্টিত একটি জেলা মৌলবভীবাজার। এই জেলার একটি প্রধান নদী হচ্ছে মনু নদী, যা মৌলভীবাজার জেলার প্রাণকেন্দ্র দিয়ে প্রবাহিত হয়। এই নদীর পাড়েই গড়ে উঠেছে সুফি সাধক হযরত সৈয়দ শাহ্ মোস্তফা (র) এর পূণ্যস্মৃতি শহর মৌলভীবাজার।

মনু নদীটি পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের ত্রিপুরা রাজ্য হতে উৎপন্ন হয়ে বাংলাদেশের কুলাউড়া উপজেলার শরীফপুর ইউনিয়ন দিয়ে প্রবেশ করে ৭৪ কিঃমিঃ (বাংলাদেশ অংশ) পথ অতিক্রম করে কুশিয়ারা নদীতে পতিত হয়। মনু নদীর মোট দৈর্ঘ্য ১৮৬ কিঃমিঃ অর্থাৎ ভারতীয় অংশে মনু নদীর দৈর্ঘ্য ১১২ কিঃমিঃ। নদীটির উপর বাংলাদেশ অংশে একটি এবং সীমান্ত থেকে ৪৮ কিঃমিঃ উজানে ভারত অংশে একটি ব্যারেজ রয়েছে। ভারত অংশে মনু নদীর উপর নির্মিত ব্যারেজের ভাটিতে মনু নদীর সাথে ডিও নদী নামক আরো একটি নদী মিলিত হয়ে বাংলাদেশ অংশে প্রবেশ করেছে।

ভারত অংশে ব্যারেজ নির্মাণের কারনে শুষ্ক মৌসুমে প্রধানত ডিও নদীর পানি মনু নদী হয়ে প্রবাহিত হয়। মনু নদীর মোট ঈধঃপযসবহঃ অৎবধ এর ৯১% বাংলাদেশের বাহিরে উজানে বিস্তৃত। বিগত ২০ বছরের হাইড্রলজিক্যাল ডাটা এনালাইসি করে দেখা যায় বর্ষাকালে নদীটিতে সর্বোচ্চ প্রায় ২৫০ পঁসবপ এবং শুস্ক মৌসুমে প্রায় ১৫.০০ পঁসবপ পানি প্রবাহিত হয়। নদীটির আকৃতি অত্যন্ত সর্পিলাকার। বর্ষা ও শুষ্ক মৌসুমে পানি প্রবাহের বিরাট তারতম্য ও পাহাড়ী নদী হওয়ার কারনে প্রচুর পলি পড়ে। নদীটি সর্পিলাকার হওয়ার কারনে এর প্রতিটি বাঁকের এক পাশে চর ও অপর পাশে ভাঙ্গন সৃষ্টি হয়।

 

পাহাড়ী নদী হবার কারনে খাড়া ঢাল থাকায় অতি দ্রæত পানি সমতল ৩-৪ মিঃ বৃদ্ধি পেয়ে ফ্ল্যাস ফ্লাড সৃষ্টি হয়। মনু নদীর ৯১% ক্যাচমেণ্ট এরিয়া উজানে ভারতীয় অংশে হবার কারনে উজানে বৃষ্টিপাত হলে অল্প সময়ে অধিক পরিমান পানি প্রবাহের সৃষ্টি হয়। ফলে ফ্ল্যাস ফ্লাডের কারনে মনু নদীতে আশির দশকে নির্মিত ১৪০ কিঃমিঃ বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের বিভিন্ন স্থানে ভাঙ্গন দেখা দেয়। এছাড়া উজানের পানির প্রবল তোড়ে মনু নদীর বিভিন্ন জাযগায় নদী ভাঙ্গন দেখা দেয়। ভাঙ্গনের এই খেলা মৌলভীবাজার জেলার ০৩ টি উপজেলার আর্থসামাজিক উন্নয়নে প্রতিনিয়তই বিরুপ প্রভাব ফেলছে। আর্থসামাজিক উন্নয়নের মাধ্যমে দেশকে একটি উন্নত রাষ্ট্রে পরিনত করার ক্ষেত্রে সমাজের সকল স্তরের মানুষের উন্নয়ন অত্যাবশকীয়। প্রতিটি মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে তার একটি স্থায়ী বাসস্থানের সংস্থানের ভ‚মিকা অপরিসীম।

 

আশির দশকে নির্মিত মনু নদীর বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ মেরামত বাজেট স্বল্পতার কারনে বিচ্ছিন্ন ভাবে মেরামত ও রক্ষনাবেক্ষন কাজ করা হলেও সম্পূর্ণ দৈর্ঘ্যে মেরামত করা সম্ভব হয় না। এর ফলে বাঁধের বিভিন্ন স্থানে ঁহফবৎ ংবপঃরড়হ-এ পরিণত হয়েছে। ফলে বর্ষকালে বন্যার পানি বাঁধ ওভারটপিং/সিপেজ করার মাধ্যমে বাঁধের ভাঙ্গন সৃষ্টি হয়। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ণ বোর্ড কর্তৃক সরেজমিনে পরিদর্শন করে দেখা গেছে প্রায় ৮৫ কিঃমিঃ দৈর্ঘ্যে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ পূনর্বাসন করা প্রয়োজন।

এছাড়া শহরাংশের গুরুত্ব বিবেচনায় বন্যা নিয়ন্ত্রন বাঁধ ছাড়াও বিকল্প প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা হিসাবে বাঁধের দেশকুলের দিকে বড়হাট হতে শাহবন্দর পর্যন্ত ২.৫০০ কিঃমিঃ অংশে নতুন ফ্লাড ওয়াল নির্মাণ করা প্রয়োজন। দীর্ঘদিন নদী খনন না হওয়ার কারনে নদীর পানি ধারন ক্ষমতা কমে গেছে। ফলে মনু নদীর ড্রেজিং কাজ বাস্তবায়ন করা প্রয়াজন। উক্ত ড্রেজিং এর মাধ্যমে নদীর নাব্যতা বৃদ্ধির সাথে সাথে প্রাপ্ত ড্রেজড ম্যাটরিয়ালস দ্বারা বাঁধ শক্তিশালীকরন ও ভূমি উন্নয়ন সম্ভব হবে যা পরবর্তীতে জীবন মান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড কর্তৃক মনু নদীর ভাঙ্গন প্রবন ৬৭ টি স্থান চিহ্নিত করা হয়েছে।

উক্ত ৬৭ টি স্থানে প্রায় ৩০ কিঃমিঃ দৈর্ঘ্যে সিসি বøক দ্বারা স্থায়ী প্রতিরক্ষা কাজ বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন। মনু নদীর সমস্যার স্থায়ী সমাধানের লক্ষ্যে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক ঘোষিত শতবছরের “ ডেল্টা প্ল্যান-২১০০” এর অংশ হিসাবে বন্যা নিয়ন্ত্রন বাঁধ পূর্নবাসন শহরাংশে ফ্ল্যাড ওয়াল নির্মান, নদী ড্রেজিং, স্থায়ী তীর সংরক্ষনমূলক কাজ অর্ন্তভ‚ক্ত করে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড “মনু নদীর ভাঙ্গন হতে মৌলভীবাজার সদর, রাজনগর ও কুলাউড়া উপজেলা রক্ষা” শীর্ষক একটি প্রকল্প গ্রহন করেছে যা বর্তমানে একনেকে চুড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে বলে যানাবন নরেন্দ্র শংকর চক্রবর্ত্তীনির্বা  প্রকৌশলী, বাপাউবো, মৌলভীবাজার।