বীর মুক্তিযোদ্ধা আজিজুর রহমান এর বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবন

মোঃ আব্দুল কালাম : মৌলভীবাজার জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান,বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহচর, বীর মুক্তিযোদ্ধা ও স্বাধীনতা পদকে মনোনীত আজিজুর রহমান এর রয়েছে এক বর্ণাঢ্য বৈচিত্রময় জীবন ।বিভিন্ন রাজনৈতিক ,সাংস্কৃতিক,সামাজিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দরা বলছেন,মৌলভীবাজার জেলার একজন অভিভাবককে আমরা হারিয়ে ফেলেছি । জেলার উন্নয়ন অগ্রগতির পিছনে উনার অবধানের অন্ত নেই উনি ছিলেন আলোর বরপুত্র ক্ষমতা,লোভ লালসা উনাকে কখনও স্পর্শ করতে পারেনি।উনার অকাল প্রয়ানে জেলায় নেমে এসেছে শোকের ছায়া।জেলার সকল জায়গাতে তিনি প্রশংসার এক মুর্তি প্রতিক হিসেবে ক্ষীয়মান সকলের কাছে
এক মহানায়ক। সুত্রে জানা যায়, করোনা আক্রান্ত হয়ে গত ৫ আগস্ট আজিজুর রহমান বিএসএমএমইউ-তে ভর্তি হন। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে তাঁকে মৌলভীবাজার থেকে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে ঢাকায় নেয়া হয়। বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনে তিনি
ছিলেন একাধিকবারের নির্বাচিত সংসদ সদস্য, সাবেক হুইপ। কেন্দ্রীয় আওয়ামীলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি, ১৪ দলের জেলা সমন্বয়কসহ গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন আজিজুর রহমান। ছিলেন গণপরিষদ সদস্য এবং বাংলাদেশের সংবিধানে স্বাক্ষরকারী। আজিজুর রহমান স্বাধীনতা সংগ্রামে অসামান্য অবদানের জন্য স্বাধীনতা পদকে মনোনীত হন।তিনি ছিলেন সরাসরি বঙ্গবন্ধু প্রভাবিত রাজনীতিবিদ, এই অঞ্চলের অহিংস ও সৌহার্দ্যপূর্ণ রাজনৈতিক ও সামাজিক বটবৃক্ষ।আজিজুর রহমান রেখে
গেলেন বর্ণাঢ্য এক জীবন বর্ষিয়ান রাজনীতিবিদ আজিজুর রহমান মৌলভীবাজার জেলার গুজারাই গ্রামের এক সমভ্রান্ত পরিবারে ১৯৪৩ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর জন্মগ্রহণ করেন। পিতা মরহুম আব্দুল সত্তার, মাতা মরহুম কাঞ্চন বিবি। তিনি শ্রীনাথ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষাজীবন শুরু করেন। মৌলভীবাজার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় হতে মাধ্যমিক ও মৌলভীবাজার সরকারি কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা গ্রহণ করেন। উচ্চ শিক্ষার জন্য ঢাকা কলেজে ভর্তি হলেও শারীরিক অসুস্থতার কারণে হবিগঞ্জের বৃন্দাবন কলেজ হতে বি.কম ডিগ্রী অর্জন করেন। ছাত্রজীবন হতেই সক্রিয় রাজনীতির সাথে জড়িত আজিজুর রহমান। বঙ্গবন্ধুর সরাসরি নির্দেশনায় ১৯৭০ সালের ঐতিহাসিক সাধারণ নির্বাচনে প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন তিনি।মুক্তিযুদ্ধের শুরুতেই ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ কারাবরণ করেন তিনি। এরপর একই বছরের ৭ এপ্রিল মুক্তিবাহিনী কর্তৃক জেল ভেঙ্গে সিলেট কারাগার থেকে তাঁকে মুক্ত করা হয়। ২ মে পুনরায় পাকবাহিনী মৌলভীবাজার শহরে প্রবেশ করে বর্বরোচিত দমন পীড়ন চালানোর পর
ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধ সংগঠনে আত্মনিয়োগ করেন তিনি।এক পর্যায়ে মুজিবনগর সরকারের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি কর্তৃক আহুত পশ্চিমবঙ্গের বাগডুগায় (দার্জিলিং) প্রথম পার্লামেন্ট অধিবেশনে যোগদান করেন আজিজুর রহমান।প্রবাসী সরকার কর্তৃক আয়োজিত সামরিক প্রশিক্ষণে সিলেট বিভাগের একমাত্র প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য হিসেবে তিনি সামরিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে এবং ৪ নম্বর সেক্টরের রাজনৈতিক কো-অর্ডিনেটর ও কমান্ডার হিসেবে
দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে সক্রিয় মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন তিনি।মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার এবং গণপরিষদ সদস্য হিসেবে ১৯৭১ সালের ৩ ডিসেম্বর শমসেরনগর, ৬ ডিসেম্বর রাজনগর এবং ৮ ডিসেম্বর মৌলভীবাজার মহকুমা
প্রশাসকের কার্যালয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলনের মাধ্যমে মৌলভীবাজারকে হানাদার মুক্ত ঘোষণা করেন আজিজুর রহমান।গণপরিষদের এই সদস্য স্বাধীন বাংলাদেশের জন্য রচিত সংবিধানের একজন স্বাক্ষরকারী। তিনি ১৯৮৬ ও ১৯৯১ সালে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।১৯৯১ সালে জাতীয় সংসদের বিরোধী দলীয় হুইপ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সে সময় সংবিধানের একাদশ ও দ্বাদশ সংশোধনীতে তিনি বিশেষ অবদান রাখেন। তিনি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ মৌলভীবাজার জেলা শাখার দুই বারের সাধারণ সম্পাদক ও দুই বার সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ও পরবর্তীতে যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ছিলেন।অকৃতদার এই রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব মৌলভীবাজার মহিলা কলেজ ও সৈয়দ শাহ মোস্তফা কলেজের প্রতিষ্ঠাকালীন সভাপতি হিসেবে শিক্ষা ক্ষেত্রে বিশেষ অবদান রাখেন। তিনি
মৌলভীবাজার জেলার অন্যতম সাংস্কৃতিক সংগঠক। সামাজিক কল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠান রেডক্রিসেন্ট সোসাইটি, মৌলভীবাজার শাখার চেয়ারম্যান হিসেবে  দায়িত্ব পালন করেন।২০১১ সালের ২০ ডিসেম্বর স্থানীয় সরকার বিভাগের
প্রজ্ঞাপনমূলে মৌলভীবাজারে প্রশাসক হিসেবে যোগদান করেন। পরবর্তীতে ২০১৬ সালের ২৮ ডিসেম্বর বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত জেলা পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন তিনি। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সেই দায়িত্ব
পালন করে গেছেন বর্ষীয়ান এ রাজনীতিবিদ। ২০২০ সালের মঙ্গলবার ১৮ আগস্ট রাত আড়াইটার দিকে তিনি ঢাকা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।পরে মৌলভীবাজার সদর উপজেলার গুজারাইস্থ পারিবারিক কবরস্থানে মা বাবার কবরের পাশে তাকে সমাহিত
করা হয়।