করোনাকালীন সময়ে জীবন ঝুঁকি নিয়ে সেবা দিয়ে যাচ্ছেন ডাঃমোয়াজ্জেম হোসেন চৌধুরী 

0
369

ডেস্ক রিপোর্টঃবাংলাদেশের ইতিহাসে মার্চ একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ মাস। মার্চের চেতনায় অনুপ্রাণিত হয়ে আমরা স্বপ্ন দেখি উন্নত, সমৃদ্ধ বাংলাদেশের। একাত্তর সালের মার্চ মাসটি ছিল লড়াইয়ের, আতঙ্কের, অবরুদ্ধ সময়ের। তখন ভয় ছিল হামলার, কারফিউ ছিল পাকিস্তানি হানাদারদের। ঠিক আবার ৪৯ বছর পর সেই মার্চ থেকেই বাংলাদেশ এমনকি সারা বিশ্ব এখনোও অধিকতর অবরুদ্ধ। বিশ্বব্যাপী ভয় এক প্রাণগাতি ভাইরাসের, যা (কোভিড-১৯) করোনাভাইরাস নামে পরিচিত।

একাত্তরের মতো এখনও আমরা এক যুদ্ধ পরিস্থিতিতে আছি। এবারের যুদ্ধে সাধারণ মানুষের একমাত্র দায়িত্ব  ছিল ঘরে থাকা। কিন্তু সশস্ত্র বাহিনী, পুলিশ, গণমাধ্যমকর্মী, গ্যাস-পানি-বিদ্যুতের মতো জরুরি সেবার কর্মীরা দিনরাত কাজ করে গেছেন। তবে এবারের যুদ্ধে মূল যোদ্ধা  হচ্ছেন ডাক্তার ও স্বাস্থ্যকর্মীরা। এবারের যে যুদ্ধাবস্থা, সেটা আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বা সার্বভৌমত্ব রক্ষার নয়, জীবন বাঁচানোর। আর এ লড়াইয়ের শেষ ভরসা হচ্ছেন ডাক্তাররা। তাদের লড়াইয়ের সব অস্ত্র নিয়েই মাঠে নামতে হয়েছে। তবে বরাবরের মতো এবারও ডাক্তাররাই আমাদের আক্রমণের লক্ষ্যে। আগে তাদের কসাই বলা হতো, এবার নাকি আরও কড়া বিশেষণ অনেকেই খোঁজছেন। তবে সব গালি যে অকারণে দেওয়া হচ্ছে, তা কিন্তু নয়। করোনা আতঙ্কে ডাক্তারদের অনেকেই স্বেচ্ছা কোয়ারেন্টিনে চলে গেছেন, চেম্বার বন্ধ রেখেছেন। ফলে সাধারণ চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। তবে এরচেয়ে বড় অভিযোগ হলো, জ্বর-কাশি শুনলেই ডাক্তাররা আর কোনও রোগী দেখছেন না। তারা ফিরিয়ে দিচ্ছেন। তবে এখানেই পার্থক্য হচ্ছে প্রকৃত নির্ভীক চিকিৎসক ও স্বার্থান্বেষী কিছু  উদাসীন চিকিৎসকদের মধ্যে। তবে মৌলভীবাজারে এই মহামারীতে জীবন বাজি রেখে মানবপ্রেমী ও দায়িত্বশীল চিকিৎসকদে  মধ্যে থেকে যিনি অনন্য নজীর স্হাপন করেছেন তিনিই হচ্ছেন বৃহত্তর সিলেটের কৃতি সন্তান মৌলভীবাজার ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতালের সদ্য অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র কনসালটেন্ট বিশিষ্ট হৃদরোগ ও মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডাঃ মোয়াজ্জেম হোসেন চৌধুরী।

 

যার নিজ কর্মগুণে আজ একজন সফল ও মানবপ্রেমিক মহত্তম ডাক্তার হিসেবে গ্রাম-গঞ্জ এবং পাড়া-মহল্লায় সাধারণ মানুষ তার উদারতার  জয়গান গাইতে দেখা গেছে। আমরা দেখেছি এই মহামারী কঠিন সংকটে প্রায় বিনা চিকিৎসায়, একের পর এক হাসপাতালে চিকিৎসা না পেয়ে মৃত্যুর একাধিক ঘটনা সারাদেশে ডাক্তারদের ভূমিকা নিয়ে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি উঠলেও উনি এক বিরল দৃষ্টান্ত স্হাপন করেছেন ।

 

বর্তমান সংকট ও অচলাবস্থা নিয়ে যখন উনার সাথে  ক্ষানিক মুহূর্তের সাক্ষাতের সুযোগ হয় তখন সাম্প্রতিক মহামারীর বিষয়ে উনার অনুভূতি জানতে চাইলে তিনি আবেগে আপ্লুত হয়ে বলেন, নিয়ম-কানুন, আইন কিছুই জানি না, একটা জিনিস বুঝি, যত ঝুঁকিই থাকুক একজন ডাক্তার কোনও অবস্থাতেই কোনও রোগীকে ফিরিয়ে দিতে পারেন না। আজ যখন এই খবরটা মিডিয়ায় আসে তখন সবচেয়ে বেশী মর্মাহত হই। তিনি আরোও বলেন, এই ঝুঁকিটা জেনেই ডাক্তাররা এই পেশায় এসেছেন।। এটা ঠিক, ডাক্তাররা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে আছেন, কিন্তু ঝুঁকি জেনেও আরও অনেক পেশার মানুষ তো রাস্তায় আছেন, কাজ করছেন। কোনও কোনও পেশার ধরনটাই এমন। আমাদের যেটা করতে হবে, ঝুঁকি যতটা সম্ভব কমিয়ে আনা যায়, তা নিশ্চিত করতে হবে আমাদের সবাইকে। কিন্তু আমি একজন মাঠের সংবাদকর্মী  হিসেবে যতটুকু কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে কিংবা উপলব্ধি করেছি বর্তমান এই কঠিন সময় মোকাবেলায় ডাঃ মোয়াজ্জেম হোসেন চৌধুরী ছিলেন সাধারণ রোগীদের  জন্য  অত্যন্ত নিবেদিত একজন চিকিৎসক ও সংগঠক ।

 

এই মহামারীতে নিজের জীবন ও নিজ পরিবারের কথা না ভেবে করোনা আক্রান্ত রোগী সহ সকল রোগীদের প্রতি উদারতা ও ভালবাসার মাধ্যমে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। যা সত্যি সত্যি আমাদেরকে করেছে মুগ্ধ। যা চিকিৎসক সমাজের কাজের ক্ষেত্রে উৎসাহের জন্য ক্ষানিকটা তুলে ধরার চেষ্টার প্রয়াস মাত্র। আজ মহামারী করোনায় যখন সারা বিশ্বব্যাপী  উদ্বেগ উৎকন্ঠায় প্রতিটা সেকেন্ড অতিবাহিত করছে দেশকে দেশ মৃত্যুপুরীতে পরিণত হচ্ছে। তখন একদল মানুষ নিজের জীবন বাজি রেখে মানবসেবায় পেশাগত দায়িত্ব পালন করছেন। বাংলাদেশের করোনা বিস্তার ঠেকাতে ও প্রতিরোধে অনেকে কাজ করে গেলেও সর্বাগ্যে চিকিৎসরাই এগিয়ে আসছেন তাদের পেশাগত দায়িত্ব ও নৈতিক বল নিয়ে। নিঃসন্দেহে তা স্বীকার করতে হয়। ইতোমধ্যে অনেক চিকিৎসক করোনা যুদ্ধে মৃত্যুবরণ করেছেন। যাদের মৃত্যুতে বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী গভীর শোক প্রকাশের পাশাপাশি তাদের পরিবারের ভরণপোষণের দায়িত্ব ও তাদের পদমর্যাদা অনুযায়ী বীমা/ইন্সুইরেন্স সহ বিভিন্ন সুবিধা দিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। আবার অনেক ডাক্তারের মৃত্যুর সংবাদ সহকর্মীদের বেদনা  থাকবেই কিন্তু আতঙ্কিত ও হতাশ হওয়ার কিছুই নেই। কারণ পেশাগত দায়িত্বের কারণে জনমানুষ তাদেরই উপর নির্ভরশীল। যদিও এখনো কোন কার্যকর ঔষধ আবিষ্কার করতে পারেনি কোন দেশও। তারপরও প্রাথমিক সেবা কার্যত পরামর্শের জন্য ডাক্তারের স্বরাপন্ন  আমাদের হতেই হয়। কিন্তু বর্তমান সময়ে অনেক চিকিৎসকরাই জীবন ঝুঁকি এড়াতে করোনা আতঙ্কে  অপারগতা প্রকাশ করে থাকেন। আবার অনেকে অতি  স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার বিধান দেখিয়ে মানব রোগীদের প্রকৃত সেবা থেকে বঞ্চিত করছেন। যার প্রমাণ হিসেবে আমি নিজেও একটি সুউচ্চ অভিজ্ঞতা সেয়ার করতে পারি। ছোট একটি বাচ্চা কে নিয়ে যখন একজন শিশু বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের স্বরাপন্ন হলাম, যদিও শিশু বাচ্চাটির করোনা উপসর্গ কোনটিই ছিল না তা জানার পরও ঐ চিকিৎসক নিজেকে স্বাস্থ্য বিধি মেনে নিজেকে এতটুকু সেইফ করলেন যে, মনে হলো উনার সাক্ষাৎ না করে টেলিমেডিসিন নেওয়াই ছিল শ্রেয়।  যাই হোক, এই সংকট এখনোও চলছে। তদুপরি এই সময়ে মুমূর্ষু  একজন রোগীকে  নিয়ে যখন আরেকজন ডাক্তারের স্বরাপন্ন হলাম তখন ভিন্ন এক অভিজ্ঞতার সঞ্চয় হলো । যিনি জীবন ঝুঁকি নিয়েও রোগীদের প্রয়োজনে করোনা রোগী সহ সকল রোগীদের কোনরুপ অবহেলা না করে বিনয় ও আন্তরিকতার সহিত সেবা দিয়ে যাচ্ছেন, আবার স্বাস্থ্য বিধিও পালন করছেন।রোগীদের প্রতি কোনরূপ কার্পন্য করছেন না।  রোগীরা হাসিমুখে সেবা নিচ্ছেন মুহূর্তেই চোখেমুখে যা এক আবেগ ভালবাসার দৃশ্য ভেসে ওঠলো। আর এই গুণান্বিত  ব্যক্তিই যিনি হচ্ছেন তিনি মানবতাবাদী ডাক্তার মোয়াজ্জেম হোসেন চৌধুরী। যিনি ইতোমধ্যে মানবতাবাদী ডাক্তার হিসেবেও খ্যাতি অর্জন করেছেন। যখন ডাক্তাররাও নিজের জীবন নিরাপত্তা নিয়ে ঝুঁকির মধ্যে থাকেন,তাদের অনেকেই ব্যক্তিগত চেম্বার করাও বন্ধ করে দিয়েছেন। কিন্তু সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম যিনি রোগীকে নিজ চেম্বারের পাশাপাশি বেসরকারি একটি ক্লিনিকেও  চিকিৎসা সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। যদিও দেশের বেসরকারি/প্রাইভেট হাসপাতালগুলো করোনাকালীন রোগীদের প্রতি উদাসীন ও জীবন নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে  বৈষম্যমূলক আচরণ করেছে বলেও অভিযোগ আছে কিন্তু এক্ষেত্রে মৌলভীবাজার শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্হিত লেইক ভিউ হাসপাতাল ছিলো ব্যতিক্রম। করোনা রোগী সহ সকল রোগীদের প্রতি আন্তরিকতা ও উষ্ণ অভ্যর্থনা ছিল প্রশংসামুখর । এক্ষেত্রে করোনা রোগীদের প্রতি যত্নশীল সেবা সহ সবধরনের প্রস্তুতি নিয়ে রোগীর পাশে ছিলেন ডাঃ মোয়াজ্জেম হোসেন চৌধুরী। মানবসেবা ও সমাজসেবায় অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ ইতোমধ্যে যিনি শেরেবাংলা স্বর্ণপদক ও স্বাধীনতা পদকে ভূষিত হয়েছেন। সাম্প্রতিক সময়ে  তার অনন্য মহত গুণে ব্যতিক্রমী বলিষ্ঠ ভুমিকা রাখায় সুস্থ হয়ে উঠা রোগীরা সহ অনেকেই  তার ভুমিকার প্রশংসা করছেন ও তার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছেন। তবে এই মহামারী সময়ে তাঁর মতো ডাক্তার এই সময় গোটা দেশে পাওয়া মুশকিল বঠে। তিনি যত বড় ডাক্তার, তাঁর চেয়েও বড় মনের মানুষ। তা না হলে কেউ নিজের জীবন ঝুঁকিতে ফেলে অন্যের জীবন বাঁচানোর উদ্যোগ নিতে পারেন না। ডাঃ মোয়াজ্জেম হোসেন চৌধুরী’র মতো কেউ কেউ পারেন। আর তাঁরা এমনটা পারেন বলেই করোনার এই মহাবিপদের দিনে এই পৃথিবী লড়াই করে যাচ্ছে।

জরুরী করোনা আক্রান্ত অসংখ্য রোগীর অক্সিজেন প্রয়োজন। কিন্তু একবারও নিজের জীবনের কথা না ভেবে অক্সিজেন নিজ হাতে লাগিয়ে দিচ্ছেন। চেকআপ করছেন অতি নিকট থেকে রোগীকে উৎসাহিত করছেন আবার স্বাস্থ্যবিধির প্রতিও নজর রাখছেন। প্রায় ৭১ বছরের বৃদ্ধ মহিলা আয়েশা খানম চৌধুরী কঠিন শারীরিক অবস্থা নিয়ে ডাঃ মোয়াজ্জেম হোসেন চৌধুরীর স্বরাপন্ন হন। বৃদ্ধ মহিলার শরীরে নানা সমস্যা থাকলেও করোনার একটি  উপসর্গ দেখা দেয়। এতে মোটেও বিচলিত হননি ডাক্তার মোয়াজ্জেম হোসেন চৌধুরী। সঠিক চিকিৎসা সেবা ও পরিচর্যায় তিনি কিছুদিনের মধ্যেই সুস্থ হয়ে ওঠেন। সুস্থ হয়ে ওঠার পর তিনি অনুভূতি প্রকাশ করে  আল্লাহর প্রতি শুকরিয়া আদায় করেন ও ডাঃ মোয়াজ্জেম হোসেন চৌধুরী’র মানবিক চিকিৎসার প্রতি শ্রদ্ধা ও তার প্রতি অপরিসীম কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। এছাড়াও তিনি বলেন আমি যতটা না চিকিৎসার মাধ্যমে সুস্থ হয়েছি তার চেয়ে বেশি ভাল হয়েছি ডাঃ মোয়াজ্জেম হোসেনের মাধুর্যপূর্ণ ব্যবহার, পরামর্শ ও অধিক উৎসাহে। উনার মতো চিকিৎসক মৌলভীবাজারে বিরল। আমি উনার দীর্ঘায়ু কামনা করছি। তাছাড়া ডাঃ মোয়াজ্জেম হোসেন চৌধুরী চিকিৎসা সেবা,  সমাজসেবা ও মানবসেবায় অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ দেশে ও বিদেশে অসংখ্য পদকে ভূষিত হয়েছেন। বৃহত্তর সিলেটের এই কৃতি সন্তান সরকারি চাকুরী থেকে অবসর গ্রহণে করলেও  জীবনের বাকি সময়টুকুও কাটিয়ে দিতে চান মানবসেবা তথা চিকিৎসা সেবায়।

পরিশেষে উনার প্রতি অসংখ্য  সালাম,শ্রদ্ধা ও ভালবাসা এবং আন্তরিক অভিনন্দন জানিয়ে পাশাপাশি দেশের সকল চিকিৎসকদের প্রতি সম্মান জানিয়ে বিদায় নিচ্ছি।

 

লেখক-মোঃ মেরাজ চৌধুরী 

সংবাদকর্মী ও মানবাধিকারকর্মী,মৌলভীবাজার